১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর সেনা ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের নির্মমভাবে ফাঁসি ও কারাদণ্ডের ঘটনা কমিশন গঠনের মাধ্যমে তদন্ত করে জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত। সেই সঙ্গে অপরাধীদের বিচারের জন্য আইন করার দাবি জানান সেই সময়ে ফাঁসির শিকার হওয়া পরিবারের স্বজন ও মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (৩০ আগস্ট) বেলা ১১ টায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় এই দাবি তুলেন বক্তারা। ১৯৭৭ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গুম ও ফাঁসির বিচারের দাবি করেন তারা।
আলোচনা সভায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, বাংলাদেশে গুম ও হত্যা জিয়াই শুরু করেছিলেন। আজকে স্বজনদের যে আর্তনাদ শুনেছি তাতে আকাশ বাতাসও মনে হয় কেঁপে উঠেছে। জীবনকে বাঁজি রেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। রাষ্ট্রস্বীকৃতি সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসে জিয়াউর রহমান ফাঁসি দিয়েছেন।
‘বিচার করার বিধি-বিধান আছে। কিন্তু কোনো নিয়ম জিয়া মানে নাই। নাম একজনের দেখে আরেকজনকে ফাঁসির কাষ্ঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আগে গুম করা হয়েছে তারপরে ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বিচার হয়েছে পরে অথচ ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে আগেই। তাদের লাশটা পর্যন্ত পাওয়া যায় নাই। আজকে তাদের স্বজনদের আর্তনাদ শুনতে হয়।’
তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে নজির রয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা যদি অপরাধ করে তাদের অপরাধকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে তাদের বিচার করার আগেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।

মরণোত্তর বিচারের অনেক নজির রয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আজকে তাদের বিচারের জন্য দাবি উঠেছে। মরণোত্তর বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। আইনের দায়িত্ব অপরাধীকে চিহ্নিত করে বিচার করা। আইনের শাসনের স্বার্থে প্রকৃত ঘটনা জনগণের জানার অধিকার রয়েছে তাই আমি মনে করি এটা হওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে কমিশন গঠন করে সেই সময়কার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
‘১৫ আগস্টে যারা আত্মস্বীকৃত খুনি তাদের জিয়া পুনর্বাসন করেছেন। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের বিরোধাতাকারী তাদের মন্ত্রী বানিয়েছেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তার নানা কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে সে পাকিস্তানিদের সহচর ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে ছিল না। সে ছিল নামধারী মুক্তিযোদ্ধা।’
এ সময় বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে নারকীয় ঘটনার মাধ্যমে হত্যা শুরু হয়। ১৯৭৭ সালেও এমনটাই করেছে বিচারের নামে। দেড় হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। বিচারের কোনো প্রক্রিয়াই মানা হয়নি। তাদের লাশ কোথায় আছে সেটা আজও অনেকেই জানে না।
সেই সব পরিবারের সদস্যদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা বিচারের জন্য ধারে ধারে ঘুরছেন। মুক্তিযুদ্ধের দল হিসেবে তাদের দাবিগুলো মেনে নেওয়া হোক।
সাবেক এই বিচারপতি আরও বলেন, বিচারের বৈধতা চ্যালেঞ্জে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দিতে পারেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জাতির সামনে উপস্থাপন করা উচিত। ১৫ আগস্টের ঘটনা তদন্ত করা, জাতীয় চার নেতা হত্যা ও ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ঘটনা গল্পে তিনটি কমিশন গঠনেরও দাবি জানান তিনি।
আলোচনা সভায় মেজর জেনারেল (অব:) হেলাল মোর্শেদ বলেন, বিচারের নামে প্রহসন করে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। দণ্ড দেওয়ার আগেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। তাদের সন্তানদের আজ এখানে এসে স্বজন হারানোর আহাজারি শুনেছি।

‘মুক্তিযোদ্ধাদের নানা আক্ষেপ ছিল। তাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপটা ছিল বিচার। সেটি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার ও মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার বিচার। ১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবরের ঘটনার বিচার না করতে পারলেও অন্তত তদন্ত করে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে জাতির সামনে তুলে ধরা উচিত ছিল। আর প্রয়োজন হলে এই বিষয়ে আইন সংশোধন করে তাদের বিচার করা প্রয়োজন।’
১৯৭৭ সালের গুম ও ফাঁসির শিকার এক সেনাকর্মকর্তার ছেলে মাকসুদুল আলম ভূঁইয়া বলেন, আমার বাবার লাশটা কোথায় আছে এখনো জানি না। সঠিক তদন্ত করে তাদের বিচার করার দাবি জানাই। তাদের কবর চিহ্নিত করে তাদের যেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। আমার মা বৃদ্ধ ও অসুস্থ হয়ে গেছে সে যেন তার স্বামীর কি হয়েছে তা জানতে পারে।
গুম ও ফাঁসির ষড়যন্ত্রের শিকার মোশরাফুল আলমের মেয়ে মাকসুদা পারভীন রিনা বলেন, কোথায় গেল আমার বাবা। আমার বাবার লাশটাও পাই নাই কবর কোথায় তাও জানি না। জিয়াউর রহমান কী করেছে আমার বাবাকে তা জানতে চাই।
সার্জেন্ট আবুল বাশারের মেয়ে বিলকিস বেগম বলেন, আমার বয়স যখন চার বছর ছিল তখন বাবাকে মারা হয়। আমার বাবা নির্দোষ ছিল। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। অথচ তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। তার করব কোথায় আছে আজো তা জানি না।
আলোচনা সভায় এ সময় উপস্থিত ছিলেন স্বজন হারা পরিবার এবং মুক্তিযোদ্ধারা।
নদী বন্দর/এসএইচ