চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য দ্রুত রোডম্যাপ দাবি করেছে বিএনপি ও হেফাজতে ইসলাম।
শনিবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দুই দলের নেতাদের বৈঠকের পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই দাবির বিষয়ে বিএনপি ও হেফাজতের মধ্যে ‘ঐকমত্য’ হয়েছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা হেফাজতে ইসলামের নেতারা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন।
সেখানে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা, ‘গণহত্যার’ বিচার, সংস্কার ও সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা বৈঠকের পর বিফ্রিংয়ে তুলে ধরেন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন।
তিনি বলেন, “আমরা যেমন সংস্কার চাই, গণহত্যারও বিচার চাই। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া উত্তরণের বিষয়টি আমরা সর্বাগ্রে বিবেচেনা করতে চাই।
আমাদের জোরালো দাবি প্রধান উপদেষ্টা অতি অবশ্যই খুব দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ দেবেন যাতে ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যায়।”
সালাহউদ্দিন বলেন, “ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচনের দাবি সাথে ওনারা (হেফাজতে ইসলাম) একমত হয়েছেন। সেজন্য হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ ও সংগঠনটির অন্তর্ভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো যথাযথ কর্মসূচি প্রণয়ন করবেন কি না, এটা ওনারা চিন্তা করে দেখবেন।”
সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন এবং জাতির সামনে অনেকবার বলেছিলেন।
“কিন্ত প্রায় সময় দেখা যাচ্ছে, কিছুদিন পর পর ডিসেম্বর থেকে জুনে, জুন থেকে ডিসেম্বরে এ রকম একটা শিফটিং দেখা যাচ্ছে এবং বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচন বিলম্বিত করারও বিভিন্নরকম পাঁয়তারা আমরা লক্ষ্য করছি।”
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, “আজকে বিএনপি মহাসচিবসহ আমরা হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করেছি। ওনাদের বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সাথে মতবিনিময় হয়েছে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হেফাজতে ইসলামের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল দাবি করে তিনি বলেন, “২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে যে গণহত্যা চালানো হয়েছে তাতে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের সঠিক সংখ্যাও এখনো নিরুপন করা হয় নাই।
“সেই শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা সেই মামলার সুষ্ঠু বিচার চায়, দ্রুত নিষ্পত্তি চায়। বিএনপি এর সাথে একমত।”
সালাহউদ্দিন বলেন, “২০২১ সালে একইভাবে আলেম সমাজের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে তাতে ২৪ জন আলেম এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী শহীদ হয়েছিলেন চট্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেই হত্যাকাণ্ডের মামলা দায়ের করা হয়েছে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে। তারা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার ও দ্রুত নিষ্পত্তি চায়, আমরা এর সাথে একমত পোষণ করি।”
তিনি বলেন, “আলেম-উলামাদের বিরুদ্ধে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অসংখ্য মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, জেলে নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং সীমাহীন নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার চায় হেফাজত। এ বিষয়েও আমরা একমত।
“আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।”
সালাহউদ্দিন বলেন, “আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য ওনাদের দাবি আছে। যে দাবি আমরা প্রকাশ্যে করেছি, লিখিতভাবে করেছি, সরকারকে জানিয়েছি এবং জাতির সামনে প্রস্তাব আকারে তুলে ধরেছি।”
“তারা সেই দাবি (আওয়ামী লীগের বিচার) উত্থাপন করেছেন। আমরা চাই, আওয়ামী লীগকে গণহত্যার দায়ে, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের আওতায় আনা হোক। সেজন্য প্রয়োজনে সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন করা যায়, আইন সংশোধন করা যায়। বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যদি আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারিত হয় সেটা দেশের জনগণ মেনে নেবে।”
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলাগুলোর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি তারা দেখছেন না দাবি করে বিএনপির এই নেতা বলেন, “জাতি প্রত্যাশা করে, এই মামলাগুলো যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। সেজন্য আমরা প্রস্তাব করছি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হোক, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি করা হোক, প্রসিকিউশন টিম, তদন্ত টিম এবং অন্যান্য সাপোর্ট বৃদ্ধি করা হোক।প্রয়োজনে বিভাগীয় পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা যায় কিনা সেটা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। এই প্রস্তাব আমরা বৈঠকে রেখেছি। এর সাথে হেফাজতে ইসলাম একমত পোষণ করেছে।”
হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজেদুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন কয়েকটি ইসলামপন্থি দল নিয়ে গঠিত এই সংগঠনের নায়েবে আমির আহমেদ আবদুল কাদের, মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, মাওলানা মহিউদ্দিন রব্বানী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও অর্থ সম্পাদক মুফতি মনির হোসাইন কাসেমী।
নদীবন্দর/ইপিটি